হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, সিএনএন এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ অব্যাহত থাকা এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির ফলে বৃহৎ তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এক্সনমোবিল ১৫.৪ বিলিয়ন ডলার এবং শেভরন ১০.৪ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শেভরনের মুনাফা বেড়েছে ১৮৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম বেড়ে রেকর্ড ৪.১২ ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন পরিবারগুলো জ্বালানি বাবদ গড়ে অতিরিক্ত ১ হাজার ১৮৪ ডলার ব্যয় করেছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথমার্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তেল ও গ্যাস খাতে বিনিয়োগের সম্পদের মূল্য বেড়ে ৩৫.৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জ্বালানির পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় অনেক ভোটার ক্ষুব্ধ। কৃষকেরাও কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়ছেন। অন্যদিকে, শীত মৌসুমে ঘর গরম রাখার জ্বালানি কিনতে অনেক পরিবারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। তাঁর দাবি, জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করেছেন এবং দেশকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।
চলতি বছরের শুরু থেকে এক্সনমোবিল ও শেভরনের শেয়ারের দাম ৫২ শতাংশ বেড়েছে। শুক্রবার বাজার খোলার আগের লেনদেনেও উভয় কোম্পানির শেয়ারের দাম ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়।
এদিকে, গত সপ্তাহের শেষ দিকে মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অর্থনৈতিক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ট্রাম্পের আর্থিক সম্পদসংক্রান্ত প্রকাশিত নথি বিশ্লেষণ করে জানতে পারেন, চলতি বছরের প্রথমার্ধে এসব কোম্পানিতে তাঁর শেয়ারের মূল্য বেড়ে ৩৫.৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে তেল ও গ্যাস খাতে তাঁর মোট সম্পদের মূল্য সর্বোচ্চ ৮১.৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ডেমোক্র্যাট সদস্যদের আরও দাবি, ২০২৬ সালে ট্রাম্পের তেল ও গ্যাস খাতের বিনিয়োগের ৯৪ শতাংশই যুদ্ধ শুরুর পর করা হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চলতি বছর তেল কোম্পানির শেয়ার থেকে ট্রাম্পের অর্জিত মুনাফায় কোনো অনিয়ম নেই। তাদের দাবি, এই মুনাফা মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের সময় শেয়ারবাজারের ইতিবাচক কার্যক্রমের প্রতিফলন, যা মার্কিন কোম্পানি ও পরিশ্রমী পরিবারগুলোর জন্য প্রকৃত আর্থিক সুবিধা বয়ে এনেছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিড ইংগল বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিংবা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য বিনিয়োগের পোর্টফোলিও কীভাবে পরিচালিত হবে, কখন শেয়ার কেনা বা বিক্রি হবে-এসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না, প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না কিংবা নির্দেশনাও দিতে পারেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগসংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে নেওয়া হয়। ফলে এখানে স্বার্থের কোনো সংঘাত নেই।
দুই দিন আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য হিল এক প্রতিবেদনে জানায়, ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে বিরোধের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের অর্থায়নের বিরোধিতা করে পেন্টাগনের বাজেট বৃদ্ধির বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের শর্তের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অন্যদিকে, কংগ্রেসের সমর্থন আদায় করতে গিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন ইস্যুতে রিপাবলিকানদের মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে জনমনে ব্যাপক অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য বড় নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। চার দিন পর অনুষ্ঠিতব্য কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আবারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যুদ্ধ শেষ হলে পেট্রলের দাম কমে যাবে। তবে এর আগেও তিনি একাধিকবার একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে পরিচালিত জনমত জরিপেও মার্কিন নাগরিকদের অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অসন্তুষ্ট। বিপরীতে, মাত্র ৩৩ শতাংশ তাঁর ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
তবে এসব জরিপের ফলাফল উপেক্ষা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিজয়ে সহায়তা করবে। অথচ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে মার্কিন নাগরিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ দেশজুড়ে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়েছে। তবে তাঁর দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার জন্য এই ব্যয় সামান্য।
এ পরিস্থিতিতে জনমত জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত থাকা-এসব বিষয় ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
আসন্ন নির্বাচনে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটি এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারে এবং সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ২১৮ এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪। অন্যদিকে, সিনেটে রিপাবলিকানদের হাতে রয়েছে ৫৩টি আসন এবং ডেমোক্র্যাটদের হাতে ৪৭টি আসন।
ট্রাম্পের জন্য আসন্ন নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং এর ফলাফল তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবশিষ্ট দুই বছরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে। নির্বাচনে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে পারবেন। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে তাঁকে এমন বিরোধী দলের মুখোমুখি হতে হবে, যারা তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করা এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যকর নজরদারি চালানোর ক্ষমতা রাখবে।
আপনার কমেন্ট